বিআরটি এর ভূমিকা

Image
বিআরটি ভূমিকা

বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) এর ভূমিকা

যাত্রী সাধারণের গতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পৃথিবীর বহুদেশে সফলতার সঙ্গে বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট সিস্টেম প্রবর্তন করা হয়েছে। বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট সিস্টেম একটি বাস ভিত্তিক গণপরিবহন ব্যবস্থা যেখানে উন্নতমানের বাসগুলো সাধারণত ডেডিকেটেড লেনে দ্রুত ও নিরাপদে চলাচল করে যাত্রী পরিবহন করে থাকে। এ পদ্ধতিতে ষ্টেশনে ঢোকার পূর্বেই যাত্রীগণকে টিকেট সংগ্রহ করতে হয় এবং ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতিতে ভাড়া আদায় করা হয়ে থাকে। বাসে উঠা নামার জন্য বাসে চওড়া দরজার ব্যবস্থা থাকে এবং বাসগুলো ষ্টেশন প্লাটফর্মের সমতলে (Level Boarding) থামিয়ে যাত্রী সাধারণের দ্রুত আরোহণ ও নির্গমনের ব্যবস্থা করে দেয়।

বিআরটি লাইন-৩ করিডোরের উত্তর অংশটি হযরত শাহাজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, টঙ্গী, চৌরাস্তা এবং শিববাড়ি-গাজীপুরসহ ২০.২ কিলোমিটার পযন্ত বিস্তৃত। বিমানবন্দর হতে গাজীপুর পর্যন্ত বিআরটি করিডোরটিতে রাস্তার মাঝখানে উভয়দিকে ১টি করে বিআরটি লেন থাকবে যা কেবল মাত্র বিআরটি বাস চলাচলের জন্য নির্ধারিত থাকবে। বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিআরটি লেনের পাশাপাশি করিডোরটিতে উভয়দিকে দুটি করে মিক্সড ট্রাফিক লেন, ১টি করে নন-মোটরাইজড বা সার্ভিস লেন এবং উভয়পাশে ফুটপাথ থাকবে। এ ছাড়া রাস্তার উভয়পাশের আড়াআড়ি রাস্তাগুলো সংস্কার করে বিআরটি ফিডার রোড হিসেবে উন্নয়ন করা হচ্ছে। ফুটপাথের নিচ দিয়ে উন্নতমানের এবং অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেইনেজ এর ব্যবস্থা থাকবে।

বিআরটি বাসের জন্য ডেডিকেটেড লেনের ব্যবস্থা এবং সড়ক প্রশস্তকরণের ফলে বিআরটি বাসগুলি করিডোরের অন্যান্য যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করবে না। এছাড়া ফ্লাইওভার এবং গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশান সমূহে মিক্সড ট্র্যাফিক লেনের গাড়ীগুলোর জন্য ইউ-টার্ন এবং ডান/বাম দিকে যাওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকবে।

বিআরটি বাসগুলোর যাতায়াত নির্বিঘ্ন এবং নিরবিচ্ছিন্ন করার জন্য করিডোরের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ যানজট প্রবণ ইন্টারসেকশনে ফ্লাই-ওভার নির্মাণাধীন রয়েছে। হাউজ বিল্ডিং থেকে চেরাগ আলী পর্যন্ত সাড়ে চার কিলোমিটার বিআরটি লেনসহ ছয় লেনের এলিভেটেড সেকশান নির্মিত হচ্ছে। বিদ্যমান চার লেনের টঙ্গী সেতুর স্থানে উভয়দিকে ১টি করে বিআরটি লেনসহ ১০ লেনবিশিষ্ট সেতু নির্মিত হচ্ছে। টঙ্গী সেতু থেকে আব্দুল্লাহপুর আশুলিয়া রোড বরাবর একটি র‌্যাম্পের ব্যবস্থা থাকবে।

এ ছাড়াও লেন পৃথকীকরণ, জ্বালানী-সাশ্রয়ী বৈদ্যুতিক সড়ক বাতি স্থাপন এবং উচ্চমানের ড্রেইনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিআরটি সিস্টেম সার্বিক ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনার মান উন্নীত করার মাধ্যমে উত্তর ঢাকার ভূদৃশ্য এবং পরিবেশের উন্নতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।

ঢাকা শহরে গণপরিবহনের সংখ্যা অপ্রতুল, বিশৃঙ্খল এবং নিম্নমানের। প্রকল্পের প্রস্তাবিত এ করিডোর এলাকায় ৬০টিরও বেশি রুটে বেসরকারী অপারেটরদের দ্বারা ২৫০০-এর বেশি বাস ও মিনিবাস পরিচালনা করা হচ্ছে। বাসবহরের বাসগুলোর অধিকাংশই ব্যবহার অনুপযোগী ও ভগ্নদশাগ্রস্থ এবং এ করিডোরে মাত্র অল্প কয়েকটি সজ্জিত বাসস্টপ রয়েছে। তবে তাতে বাসের ভ্রমনের সময়সূচী বা অন্য কোন তথ্য থাকে না। আধুনিক কোন ব্যবস্থা ও টিকেটিং পদ্ধতিও গড়ে উঠেনি।

প্রস্তাবিত প্রকল্পটি জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমিত করতে, জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জোরদার করার ক্ষেত্রে নগরায়ন এবং নগর অবকাঠামো উন্নীতকরণে বাংলাদেশের জাতীয় অগ্রাধিকারে বিশেষ অবদান রাখবে। এটি ২০০৮ সালে সরকার অনুমোদিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার সুপারিশ অনুযায়ী এডিবি-র ’সাসটেইনেবল ট্রান্সপোর্ট ইনিশিয়েটিভ অপারেশনাল প্ল্যান’-এ বর্ণিত নগর পরিবহনের উপর গুরুত্বের সাথে ভালভাবে সমন্বয় করে প্রণয়ন করা হয়েছে।

প্রকল্পটি, নগর পরিবহন খাতে অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী কর্তৃক গৃহীত প্রকল্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় নিশ্চিত করবে। এ করিডোরটি পরবর্তীতে বিশ্বব্যাঙ্কের সহায়তায় বাস্তবায়িতব্য এয়ারপোর্ট-কেরানীগঞ্জ করিডোরের সাথে সংযুক্ত হবে, সেক্ষেত্রে এটি গাজীপুর থেকে ঢাকা শহরকেন্দ্র ছাড়িয়ে কেরানীগঞ্জ অবধি ৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ গণ পরিবহন করিডোর হিসেবে পরিচালিত হবে। সেজন্য উভয় প্রকল্পের কারিগরি, পরিচালনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়াবলীর পূর্ণ সমন্বয় সাধন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সহজতর প্রাতিষ্ঠানিক এবং কারিগরি সুবিধার কারণে করিডোরের এডিবি অংশটি প্রথমে বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা পরবর্তীতে বিশ্বব্যাঙ্ক অংশটির বাস্তবায়ন সহজতর করবে। জাইকা-র অর্থায়নে উত্তরা- মতিঝিল করিডোরে বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেলের (এমআরটি লাইন-৬) প্রকল্পের সাথেও এটির নিবিড় সমন্বয় থাকবে।ফলশ্রুতিতে ঢাকার নগর পরিবহণ খাতের ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের নিমিত্তে বিশেষতঃ দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অর্জনে শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে।

২০০৫ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রণীত ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পের আওতায় ঢাকা মহানগরীর জন্য স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্লান (এসটিপি) প্রস্তুত করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে জাইকা কর্তৃক তা সংশোধন করা হলে সরকার কর্তৃক সেটি সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) হিসেবে অনুমোদিত হয় এবং এটিই নগর পরিবহন পরিকল্পনার বর্তমান ভিত্তি হিসাবে কাজ করেছে। আরএসটিপি-তে বৃহত্তর ঢাকার পরিবহণ খাতে যথাযথ বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে এবং বিআরটি লাইন-৩ সহ তিনটি বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) রুট নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে। ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট নেটওয়ার্ক ডেভলপমেন্ট স্টাডিতেও (কেইআই, জাইকা, ২০১০) বিআরটি লাইন -৩ নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে। অযান্ত্রিক যান চলাচল, পথচারী কর্তৃক যত্রতত্র রাস্তা পারাপারের পাশাপাশি উচ্চমাত্রার ট্র্যাফিক প্রবাহের কারণে দেশের উত্তরাংশ থেকে ঢাকা মহানগরীতে প্রবেশের অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ হিসেবে চিহ্নিত গাজীপুর-এয়ারপোর্ট করিডোরে প্রায়শই মারাত্মক এবং দীর্ঘস্থায়ী যানজটের সৃষ্টি হয়। এছাড়া সড়কের পূর্ব এবং পশ্চিম উভয় অংশের মধ্যে সংযোগেরও অপ্রতুলতা রয়েছে। সড়কের পাশে মূলত আরএমজি কারখানাসহ শিল্প কারখানা বেড়ে চলেছে। এরই প্রেক্ষাপটে এডিবি একটি টিএ প্রকল্পের আওতায় সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে ছয়টি প্রস্তাবিত করিডোরের মধ্য হতে গাজীপুর-টঙ্গী-বিমানবন্দর রুটটি (বিআরটি লাইন -৩ এর অংশ) বিআরটি বাস্তবায়নের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য এবং বাস্তবসম্মত করিডোর হিসেবে নির্ধারণ করেছে।

উল্লেখ্য যে, ভৌত প্রতিবন্ধকতা এবং সড়কের উভয় পাশে নির্মিত অবকাঠামোর কারণে এ রাস্তাটি প্রয়োজন অনুযায়ী আরও প্রশস্ত করার অবকাশ নেই। তাছাড়া রেলভিত্তিক গনপরিবহন ব্যবস্থা নির্মাণ এবং বাস্তবায়ন, বিআরটি এর চেয়ে প্রায় ১০ গুন বেশী ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। তাই অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে দ্রুত সময়ে এবং স্বল্প ব্যয়ে একমাত্র বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করেই এ রাস্তার যানজট নিরসন করা সম্ভব হতে পারে।